মুক্তিটা কি তবে আসবে না?

0 comment 30 views

আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ১৯০৫ সালে। তখন বাংলাকে ভেঙে দু টুকরো করা হয়েছিল। বাংলা তো তখন ভারতবর্ষের প্রদেশ। আকৃতিতে বড় ছিল তখন। অনেক বড়। বাংলার সঙ্গে জুড়ে ছিল বিহার, উড়িষ্যা আর ছোটনাগপুর। বাংলার আয়তন তখন ছিল বিশাল-  ১ লক্ষ ৮৯ হাজার বর্গমাইল। ব্রিটিশ সরকার বলল এতবড় আয়তনের ফলে বাংলাকে শাসন করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশরা শাসনে সুবিধা করতে বাংলাকে ভেঙে আসামের সঙ্গে জুড়ে দিল। বাংলাকে ভেঙে ফেলার ব্যাখ্যা হিসেবে তারা জানালো, প্রশাসনিক কাজ চালানোয় দারুণ অসুবিধা। বলল, প্রদেশ হিসাবে বাংলা তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আয়তনে অনেক বড় বলে একটি কেন্দ্র থেকে এর প্রশাসন চালানো অসুবিধা। তবে দু’টি প্রদেশ গঠন করলে সরকার ও জনগণ উভয়ের জন্যেই সুবিধা হবে। তারা বলল, নতুন প্রদেশটির নাম হবে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’। রাজধানী হবে ঢাকা আর অনুষঙ্গী সদর দফতর করা হবে চট্টগ্রামকে। পূর্ববঙ্গ ও আসামের  আয়তন হবে ১ লক্ষ ৬ হাজার ৫৪০ বর্গমাইল। ব্রিটিশ সরকার নির্দেশ দিল, পূর্ববঙ্গ ও আসামের পশ্চিম সীমানা স্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট থাকবে এবং এর সঙ্গে ভৌগোলিক, জাতিগত, ভাষাগত আর সামাজিক বৈশিষ্ট্যও নির্দিষ্ট করা থাকবে। কিন্তু বাঙালিরা ব্রিটিশদের এই বিভাজন ও যুক্তি- কোনোটিই মেনে নেয় নি। তাঁরা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে রাজপথে নামল।

রবীন্দ্রনাথ এর প্রতিবাদ করে লিখলেন- ‘ঈশ্বর যে বাঙালিকে বিচ্ছিন্ন করেন নাই…।’ প্রচণ্ড গণআন্দোলনে বঙ্গভঙ্গ রদ হয় ১৯১১ সালে। এই ছয় বছরে রবীন্দ্রনাথ অসংখ্য গান আর কবিতা লিখে এই আন্দোলনকে উৎসাহিত করেছেন। আমাদের জাতীয় সঙ্গীতটি রবীন্দ্রনাথ তখনই লিখেছিলেন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও তার ফাটলটি কিন্তু থেকেই গেল। এর বিয়াল্লিশ বছর পর ১৯৪৭ সালে বাংলাকে আবারও ভাঙা হলো। ভেঙে করা হলো পাকিস্তান। আগেরবার ভেঙে করা হয়েছিল প্রদেশ। এবারে করা হলো রাষ্ট্র। ভারত আর পাকিস্তান – দু’টা আলাদা রাষ্ট্র। ভাঙা হলো ধর্মের ভিত্তিতে। শুধুমাত্র ধর্মকে আঁকড়ে ধরে বাংলাকে জুড়ে দেয়া হলো প্রায় তিন হাজার মাইল ব্যবধানের ভূখণ্ড পাকিস্তানের সঙ্গে। এবারে বাংলার নামটিই তার নাম থেকে মুছে দেয়া হলো।  বাংলার নাম রাখা হলো পূর্ব পাকিস্তান। এও ধর্মের ভিত্তিতেই।

ধর্ম হলো অতীন্দ্রিয় এবং আধ্যাত্মিকতা। এর অনুশীলনে মানুষের নৈতিকতা, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক উপাদানগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে সংস্কৃতি হলো সামগ্রিকতা যাতে আছে জ্ঞান, বিশ্বাস, নৈতিকতা, শিল্প, আইন, রাজনীতি, আচার। যা  অর্জন করতে হয়। সংস্কৃতি মানুষের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করে। ফলে ধর্ম সম্পর্কে অবিকল কোনো একটি ধর্ম গঠন করে তা নিয়ে কোনো পণ্ডিতদের ঐক্যমত নেই। কিন্তু সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই ঐক্যমত বিরাজমান।

সেকারণে বাংলাদেশ হওয়াটা অনিবার্য ছিল। সেকারণে বাংলাদেশকে স্বাধীন হতেই হতো। সেকারণেই স্বাধীন না হয়ে বাংলাদেশের কোনো উপায় ছিল না। বাংলাদেশ যে স্বাধীন হবে, পাকিস্তান থাকবে না, সেটি বোঝা গিয়েছিল বায়ান্নতেই। যখন ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে রেসকোর্স ময়দানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক সমাবেশে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা’। এই ঘোষণায় জিন্নাহ দেখিয়ে দিয়েছিলেন তিনি কতখানি জনবিচ্ছিন্ন। আর জানিয়েছিলেন এই ভূখণ্ডের মানুষদের সম্পর্কে তিনি কতটা অজ্ঞ। মজার ব্যাপার হলো, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ওইটিই ছিল গুজরাটি বংশদ্ভুত ও পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর প্রথম ও শেষ আগমন। আর কখনো তিনি আসেন নি  বাংলায়। অথচ রাষ্ট্র ভাষা উর্দু করবার এই ঘোষণাটি জিন্নাহ দিয়েছিলেন ইংরেজি ভাষায়। বস্তুত রাষ্ট্র ভাষা উর্দু করবার এই ঘোষণার পুরো ব্যাপারটিই ছিল রাজনৈতিক। অবাস্তব তো বটেই। যতটা অবাস্তব ছিল জিন্নাহর ভারতীয় মুসলিমদের নিজস্ব রাষ্ট্র থাকতে হবে বলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ধারণা- ঠিক ততটাই। কেননা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা গেছে ঠিকই কিন্তু ভারতের সকল মুসলিম তো সে পাকিস্তানে চলে যায় নি। যেটা হয়েছে, দেশ বদলের এই সিদ্ধান্তে হিন্দু-মুসলমান দুইয়েরই ভোগান্তি হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ তাদের সর্বস্ব খুইয়েছে। মারাও পড়েছে অসংখ্য মানুষ।

ইংরেজিতে সে ভাষণে জিন্নাহ বললেন, ‘আমি খুব স্পষ্ট করেই আপনাদের বলছি যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, এবং অন্য কোনো ভাষা নয়। কেউ যদি আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে তাহলে সে আসলে পাকিস্তানের শত্রু।’

জিন্নাহ ছিলেন করাচির লোক। হয়ত সেকারণেই পাকিস্তানের রাজধানী বানালেন করাচিকে। আর এই যে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করবার ঘোষণা দিলেন, পাকিস্তানে উর্দুতে কিন্তু খুব কম লোকেই কথা বলত। উর্দু ছিল পাকিস্তানের পশ্চিম অংশের ভাষা।

তো ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদের মতো করে রাষ্ট্র ভাষা উর্দু করবার প্রতিবাদে ফেটে পড়ে ঢাকার ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা। তাঁরা বললেন, পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষা ও সরকারি কাজকর্ম পরিচালনার মাধ্যম হবে বাংলা আর কেন্দ্রীয় সরকার পর্যায়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে দুটি বাংলা ও উর্দু। শুরু হলো ভাষা আন্দোলন। সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশ-শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন।  ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের হাজার হাজার ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হলো। ছাত্ররা ছোট ছোট দলে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলে পুলিশ লাঠিচার্জ করলেন। আক্রান্ত হলো ছাত্রীরাও। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সামলাতে ব্যর্থ হয়ে গণপরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসররত মিছিলে পুলিশ গুলি চালাল। গুলিতে  রফিক উদ্দিন আহমদ,  আবদুল জববার, আবুল বরকত মারা গেল। দিনটি ছিল ১৯৫২ সালের পর থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি।

পাকিস্তান যে টিকবে না, বাংলাদেশ যে স্বাধীন হবে এইটি সেদিন ওই ২১ ফেব্রুয়ারিতেই বুঝতে পারা গিয়েছিল। কিন্তু এই বুঝতে পারাটা বুঝতে পারে নি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী। ফলে ৫২-এর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক এই আন্দোলন, ভাষা আন্দোলনকে তারা গুরুত্ব দেয় নি। গুরুত্ব তো দেয়ই নি উল্টো অবমূল্যায়ন করেছে। ’৫২-এর পথ ধরে তাই বারবার আন্দোলন দানা বেঁধেছে। এসেছে ’৬২, ’৬৬, ’৬৯ এবং অবশেষে ১৯৭১- মহান মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু শাসক গোষ্ঠী কোনো কিছুকেই পাত্তা দেয় নি। নিজেদের দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী মনে করে দারুণ অহংকার আর শক্তিতে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ তাঁরা তাতেও পাত্তা দেয় নি। প্রতারণা করে ২৫ মার্চে অপারেশন সার্চলাইট নাম দিয়ে মানব ইতিহাসের নিকৃষ্টতম গণহত্যাটি চালিয়েছে। অমন হত্যাযজ্ঞতে বাঙালি ঘাবড়ে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু প্রতিরোধ গড়তে সময় নেয় নি। ঠিক পরদিনই ২৬ মার্চেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ফেলে শুরু করেছে মুক্তির যুদ্ধ। এবং মাত্র নয় মাস সময়ে সে যুদ্ধে বিজয়ীও হয়েছে।

কিন্তু মুক্তিটা কি এসেছে?

সেপ্টেম্বরের পূর্ব পাকিস্তানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরেপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ বলে কিছু ছিল না। এবং এই চারটির অভাব ছিল বলেই শাসক গোষ্ঠীর পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে নিষ্পেষণ করতে সহায়তা করছিল। এবং এই চারটি দাবি প্রতিষ্ঠা করতেই সংগঠিত হয়েছিল মুক্তির যুদ্ধ। কেননা এই চারটি দাবি প্রতিষ্ঠা পেলেই মানুষের মুক্তি ঘটবে। এইই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যাকে আমরা বলি, পঞ্চাশটা বছরেও স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রটিতে সে চেতনা প্রতিষ্ঠা করা যায় নি। মুক্তিযুদ্ধের সূত্র ধরেই বলতে পারি, মুক্তিটা আসলে আসে নি। আমরা তবে এখনো শোষিত হয়েই চলেছি। মুক্তিটা কি তবে আসবে না?

দেশকণ্ঠ, ফেব্রুয়ারি ২০২২।

Leave a Comment

You may also like

Copyright @2023 – All Right Reserved by Shah’s Writing