দরকার ঠিক জায়গাতে ঠিক মানুষটি

0 comment 32 views

গেল ৭ ডিসেম্বর নিউ ইয়র্কে প্রথম গাইবান্ধা মুক্ত দিবস উদযাপন করল গাইবান্ধা সোসাইটি। ৭ ডিসেম্বর, বাংলাদেশ তখন চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। তবে ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদিন একটি বাংলাদেশকে ৬ ডিসেম্বর ভারত স্বীকৃতি দিয়েছিল। পরদিন ৭ ডিসেম্বর সে খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ অনানুষ্ঠানিকভাবে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করল।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম দৈনিক ইত্তেফাকের খবরটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন, “নয়াদিল্লী, ছয়ই ডিসেম্বর । এপিপি/রয়টার ভারত আজ বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ।” তিনি ভাবছিলেন, বাংলাদেশ । স্বাধীন বাংলাদেশ । একটি স্বাধীন জাতি । তাঁর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল । তিনি ভাবছিলেন তাঁর পুত্র রুমীর কথা। রুমী এখন কোথায় ? রুমীকে পাক আর্মি বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেছে, এটা সমর্থিত খবর। কিন্তু রুমীকে মেরে ফেলেছে কি না এটার কোনো সমর্থিত খবর তো তিনি পান নি । পাগলাপীর বলেন, রুমী বেঁচে আছে । পাগলাপীরের কাছে যারাই যায় – মোশফেকা মাহমুদ, মাহমুদা হক, ঝিনু মাহমুদ, রাঙামা, নুহেল-দীনু-খনু-লীনু, শিমুল, জেবুন্নেসা, জাহাঙ্গীর, নাজমা মজিদ সবাইকেই পাগলা বাবা ঐ একই কথা বলেন, ‘আছে, আছে, তোর স্বামী বেঁচে আছে । তোর ছেলে মরে নি । তোর ভাই শিগগিরিই ফিরে আসবে।’ (১)

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বই থেকে আমরা তাঁর অপেক্ষা, যন্ত্রণা অনুভূতিগুলো জানি। মতো কত শত অগণিত মা যে অপেক্ষায় ছিলেন সন্তানের! সে খবর কি আমরা জানি? জানতে চাইলেও জানা যায় না আসলে।

১৯৪৬ সালে ভারত ভাগ করে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল এদেশের মানুষ। এরপর ‘৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে দু পাশে হলো দুই পাকিস্তান, পশ্চিম আর পূব। আমরা হলাম পূবের অংশ। কিন্তু মুসলিম লীগ গণতন্ত্রের চর্চা করত না। এছাড়া সকল ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল পশ্চিমের শাসক গোষ্ঠী। এর বিপরীতে পূবের মানুষদের ওপর চালাতে লাগল নিপীড়ন। প্রকট হলো বৈষম্য। একটি যে কোনও দেশ ও সে দেশের মানুষদের শ্রেণিগত অবস্থান নির্ণয় করে অর্থনৈতিক ভিত্তি। আমাদের ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তে লাগল। তার সঙ্গে সেঁটে থাকল জাতিগত নিপীড়ন। সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও আমরা হয়ে গেলাম দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। যে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান হলো, যে ধর্মের কারণে এদেশের মানুষ পশ্চিম থেকে প্রায় বারোস শ’ মাইল দূরে থেকেও পাকিস্তানের পূব অংশ হয়ে থাকল, সে ধর্মের দোহাই দিয়েই এদেশে আক্রমণের সূচনা করল পশ্চিম পাকিস্তানিরা। এবং এই কাজটি করলেন পাকিস্তান আন্দোলনের যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারাই। কেননা তারা বুঝতে পেরেছিলেন স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে ধর্মের ব্যবহারের কোনও জুড়ি নেই।

পাকিস্তানি গবেষক জিয়াউল হক এর ব্যাখ্যা করে লিখেছেন, ‘সামাজিক দায়িত্ববোধ ও সততা থেকে বিচ্ছিন্ন এই ধর্মবোধের ওপর বেশি গুরুত্ব নানা রকম ভণ্ডামির জন্ম দেয় এবং শাসকশ্রেণির হাতকেই আরও শক্তিশালী করে। ধর্মের রাজনীতিকেরা দরিদ্র জনগণের বিভ্রান্তি ও তাদের ওপর শোষণকেই আরও বৃদ্ধি করে এবং যে দুর্নীতিকে তারা চারদিকে দেখে আসছে এবং যে দুর্নীতির ভেতর তারা দীর্ঘকাল ধরে আটকে রয়েছে, সেটাই বৃদ্ধি করে । ধর্মের বাহ্যিক আচার-আচরণ একধরনের প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করে, যা দিয়ে এর প্রবক্তারা নিজেদের সামন্ততন্ত্র ও পুঁজিবাদসৃষ্ট দুর্নীতির ক্লেদ থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করে।’

পশ্চিম পাকিস্তানের মেজর জেনারেল ফজল মুকিম খান বলেছিলেন, ‘মুসলমানদের বাঙালিরা পছন্দ করত না। পছন্দ করত হিন্দুদের।’ মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী বলেছিলেন, বাঙালিরা ধুতি পরে। অর্থাৎ হিন্দুদের অনুসরণ করে। (২)

রাও ফরমান আলী মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানে খুবই ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ছিলেন। এই লোক একাত্তরে ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অন্যতম উচ্চপদস্থ অফিসার। ইনি পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক পুলিশ ও রাজাকারসহ নিরাপত্তা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কর্মকাণ্ড সম্পাদন ও তদারক করতেন। বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যায় রাও ফরমান আলী প্রধান অভিযুক্তদের অন্যতম। তিনিই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। অথচ দেখুন এরা সনদ দিয়ে বেড়িয়েছে আমরা মুসলমান কিনা! অথচ নিজেরা মদ্য পান, নারী সঙ্গ এবং নানান অপকর্ম করে বেরিয়েছে।

ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান করা হয়েছিল। আবার এই ধর্মকে ব্যবহার করেই এদেশের মানুষকে বঞ্চিত করতে লাগল। যখন মানুষ প্রতিবাদ করল তখন মেরে ফেলতে লাগল। গণহত্যা চালাতে লাগল। তিরিশ লক্ষ মানুষকে মেরে ফেলল তারা। চার লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করল পাকিস্তানি সেনা আর তাদের সহযোগী রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী।

আমরা বুঝতে পারলাম ধর্মের এই ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বন্ধ করে দিতে হবে মানুষে মানুষে বৈষম্য সৃষ্টির পথটিকেও। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও মূলনীতি তাই করা হলো জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। দেশ শত্রুমুক্ত হবার পর ‘৭২-এ প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানেও রাষ্ট্রপরিচালনার চার মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হলো। কিন্তু ওই শুরু, ওই শেষ। সবসময়ই এই ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। ফলে ভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যেন আপনাপন নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন- সেকারণেই রাষ্ট্রের পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া জরুরি।

কিন্তু একান্নতম বিজয় দিবস উদযাপন হলেও আজও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে নি। শিক্ষা ব্যবস্থার নানান টেস্ট ড্রাইভের ফলে জাতীয়তাবাদ আসলে কি বস্তু এইটিই আমাদের ধারণাতে আঁটে নি। জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে বাঙালী এখন দু ভাগে বিভক্ত- বাঙালী ও বাংলাদেশী। সমাজতন্ত্র নিয়ে বলবার নেই কিছু। আর গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে আইসিইউতে। অথচ স্বপ্ন আমাদের খাটো নয় মোটেই। খাটো নয় আমাদের যোগ্যতাতেও। কেবল একটিই সমস্যা, যার যেখানে থাকবার দরকার, সে সেখানটাতে নেই। আমাদের এখন দরকার সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষটি।

তথ্যসূত্র:

১. একাত্তরের দিনগুলি – জাহানারা ইমাম

২. পাকিস্তানি মণ – মুনতাসীর মামুন

মুসলমানদের বিরুদ্ধে মোদির লড়াই

Leave a Comment

You may also like

Copyright @2023 – All Right Reserved by Shah’s Writing