কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি নয়, আসুন নিজেকে সন্মান করি

0 comment 27 views

দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ প্রতিবছর জুলাইয়ে একটি উৎসব পালন করে। খুব জনপ্রিয় এই উৎসব নাম কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। উৎসবে আক্ষরিক অর্থেই কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করা হয়। ভীষণ আনন্দে একজন আরেকজনের গায়ে কাদা ছুঁড়ে মারে, এরপর হাসিতে ভেঙে পড়ে।

না, দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষের সফলতায় কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির কোনও ভূমিকা নেই। তাঁদের যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি তার পেছনে রয়েছে সে দেশের মানুষের কঠোর পরিশ্রম। তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেন। কাজের প্রতি তাঁদের একাগ্রতা অসীম। এজন্যেই দক্ষিণ কোরিয়া গেল পঞ্চাশ বছরে উন্নয়নশীল দেশ থেকে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

বাংলাদেশে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি নিয়ে কোনও খেলা নেই। তবে বাংলা ভাষা তো আছে। আর বাংলাদেশের মানুষ নিন্দা করতে, অপবাদ দিতে, দুর্নাম রটাতে, কলংকিত করতে, সর্বোপরি কথা দিয়ে আঘাত করতে খুব পছন্দ করে। এবং আমাদের বাংলা ভাষায় এটিকে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বলা হয়।

এই নিউ ইয়র্কে পৃথিবীর অনেক অনেক দেশের মানুষ বাস করেন কিন্তু বাঙালীদের মতো পরস্পরের প্রতি এমন শত্রুভাবাপন্ন আর কোনও দেশ ও জাতির মানুষদের মধ্যে আমি দেখি নি। আমার এই মন্তব্যটির জন্যে আমি আপনাদের সকলের কাছে ক্ষমা চাইছি। কিন্তু আপনারাই বলুন তো, মন্তব্যে যে বক্তব্য আছে- তার কতটা ভুল? কিংবা এটিও ভাবুন, নিজের মানুষদের সম্পর্কে এমন করে প্রকাশ্যে যে লোকটা বলছে- সে কেন বলছে এভাবে?

জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ স্ট্রিটের নাম বদলে ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’ রাখা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের সকল মানুষদের জন্যেই অনেক বড় একটি অ্যাচিভমেন্ট। নামকরণের উদ্বোধনের দিন ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল মেম্বার ও নিউ ইয়র্ক শহরের সড়ক নামকরণ কমিটির চেয়ারম্যান শেখর কৃষ্ণান বলেছিলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যারা নিজেদের ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছে। নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভাষাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশিরা আমেরিকাতেও এক বিশাল জনসমাজ গড়ে তুলেছে।

আমি জানি না কয়টি দেশ ও জাতির মানুষ এমন সন্মানজনক অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছে। অথচ জ্যাকসন হাইটসে বাংলাদেশীদের মধ্যে কি চলছে?

চলছে দলাদলি, চলছে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে দ্বন্দ্ব, চলছে ভিলেজ পলিটিক্সের মতো নোংরামি, চলছে একে অন্যের নামে কুৎসা গাওয়া। আগে এগুলো আড়ালে চলত। আজকাল আর কেউ আড়াল মানেন না। মুখোমুখি দাঁড়িয়েই অপবাদ দিচ্ছেন অপরকে, তার দুর্নাম করছেন, উত্তেজনায় এটিও ভাবছেন না তিনি রয়েছেন হয়ত কোনও অনুষ্ঠানে অথবা মঞ্চে, অন্যের সম্পর্কে যা বলে চলেছেন তার কতটা সত্য আর কতটা মনগড়া এটা নিয়েও চিন্তা করছেন না।

ফলটা কি দাঁড়াচ্ছে জানেন?

যাদের কাজের জন্যে জ্যাকসন হাইটসে বাংলাদেশ স্ট্রিট হয়েছে, যারা বাংলাদেশকে, বাঙালীকে আমেরিকার মাটিতে মাথা তুলে দাঁড় করাতে অবদান রেখেছেন- তাঁরা জ্যাকসন হাইটস বর্জন করেছেন। তাঁরা এখন জ্যাকসন হাইটসকে এড়িয়ে চলেন।

এই মে মাসেই সিটি অ্যান্ড স্টেট নিউ ইয়র্ক প্রকাশ করেছে ‘দ্য ২০২৪ পাওয়ার অফ ডাইভার্সিটি: এশিয়ান ১০০’ তালিকা। এই তালিকায় বাংলাদেশের তিনজন মানুষ আছেন। এঁদেরকে গেল এক বছরে জ্যাকসন হাইটসে ক’বার দেখেছেন বলতে পারেন? আচ্ছা, এঁদের কথা ছাড়ুন। আরও যারা রয়েছেন, দেশে যাদেরকে আমরা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি বলে অভিহিত করি- তাঁরা কি আসেন জ্যাকসন হাইটসে?

নিউ ইয়র্কে নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয় যার প্রায় সবই জ্যাকসন হাইটসে আয়োজিত। সেসব অনুষ্ঠানের কেবল ব্যানার বদলে যায় কিন্তু অনুষ্ঠানে আগত মানুষগুলোর সকলেই কি একই নন যারা আগের অনুষ্ঠানের মঞ্চে বা দর্শকসারিতে ছিলেন?

জ্যাকসন হাইটসকে ও এখানকার অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলে আরেকটি শ্রেণি- আমাদের নতুন প্রজন্ম। আপনাদের কথা জানি না, কিন্তু আমার ছেলেমেয়েরা কোনও অনুষ্ঠানে যেতে আগ্রহ দেখায় না। নিজের শেকড়ের টানের প্রতি আগ্রহ কেন জাগে না আমাদের নতুন প্রজন্মের? কে জানেন? কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি দেখতে তাদের ভালো লাগে না। কেউ কারও নামে সত্য কি সত্য নয় এমন নিন্দা বলে বেড়াচ্ছে- এটিই তো তারা ভাবতে পারে না!

বাচ্চারা অবাক হয়ে ভাবে আমাদের কাছে যে সুজলা সুফলা শস্য শ্যমলা বাংলাদেশের গল্প শুনে এসেছে, বাংলাদেশের যে সহজতা ও সরলতা মাখা মানুষদের কথা শুনে এসেছে তারা এতদিন- নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে সেসব মানুষেরা কোথায়?

আচ্ছা বলুন তো, কাল আপনার সন্তানই যদি ঠিক এই প্রশ্নটিই আপনাকে করে বসে- আপনি উত্তর দেবেন?

মনে রাখবেন, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি শুধু মানুষে মানুষে দূরত্বই তৈরি করে। কিন্তু আপনার গায়ে কাদা ছুঁড়তে গেলে আমার হাতও কাদায় মাখামাখি হবে।

ভালো থাকবেন😊ভালোবাসবেন।

Leave a Comment

You may also like

Copyright @2023 – All Right Reserved by Shah’s Writing